আমিরুল ইসলাম জীবন ফুলবাড়িয়া উপজেলা প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার দোলমা গ্রাম (সাপমারা) এলাকায় প্রতিবছর নবী পিরসাহেবের উরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। ভক্ত, মুরিদ ও দর্শনার্থীদের সমাগমে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। মিলাত, মাফিল, সামা কাওয়ালির পরিবেশনা থাকে, পাশাপাশি ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য খাবারের আয়োজনও করা হয়। কিন্তু এবছর ইসলামি তাওহীদি জনতার প্রবল আপত্তির মুখে আয়োজকদের বাধ্য হয়ে উরস বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ফলে পুরো আয়োজন স্থবির হয়ে পড়ে, দোকানপাট ফাঁকা থাকে, ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন এবং স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
উরস আয়োজনে কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মাঠ পরিষ্কার করা, আলোকসজ্জা, প্যান্ডেল তৈরি, অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করা—সবকিছু ধাপে ধাপে সম্পন্ন হচ্ছিল। বিশেষ করে, কাওয়ালি ও মিলাত মাহফিলের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গায়ক ও ওলামাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। খাবারের জন্য প্রচুর পরিমাণে চাল, মাংস ও অন্যান্য উপকরণ মজুদ করা হয়েছিল।
একজন আয়োজক বলেন, "আমরা অনেক আগ থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। প্রতিবারের মতো এবারও হাজার হাজার মানুষ আসবে ভেবে সব আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে বাধা আসবে, তা ভাবতেই পারিনি।"
ইসলামি তাওহীদি জনতার দাবি, ইসলামে উরসের কোনো স্থান নেই, এটি সম্পূর্ণ বিদআত এবং শরীয়তসম্মত নয়। তাই তারা এই আয়োজন বন্ধের জন্য সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করেন।
একজন তাওহীদি জনতা নেতা বলেন, "আমরা কুরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে চলতে চাই। নবীজি বা সাহাবারা কখনো এমন আয়োজন করেননি। এটি ধর্মের নামে নতুন কিছু যোগ করার চেষ্টা, যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী।"
তাদের আন্দোলন ছিল সুসংগঠিত। গ্রামে আগেই মিটিং-মাহফিলের মাধ্যমে তারা উরসের বিপক্ষে জনমত গড়ে তোলে। এরপর দলগতভাবে তারা উরসস্থলে গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে আয়োজকদের চাপ দেয়।
প্রতিবছর উরসকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ আসেন, মেলা বসে, বিভিন্ন দোকানপাট বসে। কিন্তু এবার উরস বন্ধ হওয়ায় দোকানগুলোতে বেচাকেনা হয়নি। অনেক দোকানদার ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একজন ব্যবসায়ী বলেন, "প্রতি বছর এখানে প্রচুর বিক্রি হয়। কিন্তু এবার কেউ কেনাকাটা করল না। সারারাত দোকান খোলা রেখেও কোনো লাভ হলো না।"
স্থানীয় একজন খাবার বিক্রেতা বলেন, "অনেক খাবার তৈরি করেছিলাম, কিন্তু মানুষই আসেনি। সব খাবার নষ্ট হয়ে গেল।"
উরস প্রাঙ্গণ, যা সাধারণত আলোকসজ্জায় ঝলমল করে, এবার একেবারে শূন্য ছিল। কাওয়ালি ও মিলাত যেখানে চলার কথা ছিল, সেখানে নীরবতা বিরাজ করছিল।
উরস বন্ধ হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এক পক্ষ উরসকে ধর্মীয় আচার ও ঐতিহ্য মনে করে, অন্য পক্ষ এটিকে ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী বলে মনে করে।
উরস সমর্থকদের একজন বলেন, "এটা আমাদের বহু বছরের ঐতিহ্য। আমরা নবী-পিরদের ভালোবাসি, তাদের স্মরণে মিলাত করি, দোয়া পড়ি। এতে দোষের কিছু দেখি না।"
অন্যদিকে, এক তাওহীদি জনতা সমর্থক বলেন, "শরীয়তবিরোধী কিছুই আমরা মেনে নেব না। মানুষকে আসল ইসলামের দিকে ফেরাতে হবে।"
দোলমা গ্রামে এবছরের উরস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক ধরনের অস্থিরতা ও হতাশা তৈরি হয়েছে। একদিকে আয়োজকদের কষ্ট, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি, আরেকদিকে ধর্মীয় মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উরসপন্থী ও তাওহীদি জনতার মধ্যে এই মতবিরোধ ভবিষ্যতে আরও বড় আকার নিতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
[caption id="attachment_4374" align="alignleft" width="300"] আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন:০১৯৬৮৫২৫৮৭৭[/caption]